ইসি’র সার্ভারে সিসিকের দিপুর থাবা! – তদন্ত রিপোর্ট

শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৪৯ অপরাহ্ন

ইসি’র সার্ভারে সিসিকের দিপুর থাবা!

ইসি’র সার্ভারে সিসিকের দিপুর থাবা!

মোঃ রায়হান হোসেন: সিলেট সিটি কর্পোরেশনে (সিসিক) জন্ম নিবন্ধন তৈরি করতে আসা সাধারণ নাগরিকরা এক অভিনব ও সুকৌশলী চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন। অভিযোগ উঠেছে, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা শাখার ডাটা অপারেটর রিটন আহমদ দিপু একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট তৈরি করে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সার্ভার কপির নামে নাগরিকদের জিম্মি করে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের (এনআইডি ডাব্লিউ) সুরক্ষিত সার্ভারে অবৈধ অনুপ্রবেশ বা হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে তিনি এই কার্যক্রম চালাচ্ছেন বলেও গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।

জন্ম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতার পিতা-মাতার এনআইডি সার্ভার কপি বাধ্যতামূলক। আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক এখতিয়ার অনুযায়ী এই কপি সাধারণত আঞ্চলিক বা জেলা নির্বাচন অফিস থেকে সংগ্রহ করার কথা, যার জন্য কোনো বাড়তি ফির প্রয়োজন হয় না। কিন্তু সিসিক-এর ডাটা এন্ট্রি অপারেটর রিটন আহমদ দিপু নির্বাচন কার্যালয়ের কোনো প্রকার পূর্বানুমতি ছাড়াই প্রতিটি এনআইডি সার্ভার কপির বিনিময়ে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে অবৈধভাবে আদায় করছেন। সরকারি নিয়মানুযায়ী যেকোনো আর্থিক লেনদেনের বিপরীতে রসিদ বা ভাউচার প্রদান বাধ্যতামূলক হলেও, দিপু তা প্রদানে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানান।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সিসিক-এ জন্ম নিবন্ধন সেকশনে এক অঘোষিত স্বৈরতন্ত্র চলছে। কোনো সেবাগ্রহীতা যদি নিজস্ব উদ্যোগে নির্বাচন অফিস বা অন্য কোনো বৈধ মাধ্যম থেকে এনআইডির সার্ভার কপি সংগ্রহ করে আনেন, তবে দায়িত্বশীলরা তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। তাদের অলিখিত শর্ত হলো সার্ভার কপিটি অবশ্যই ডাটা এন্ট্রি অপারেটর দিপুর কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে সংগ্রহ করতে হবে এবং সেটিতে দিপুর স্বাক্ষর থাকতে হবে। অন্যথায় নাগরিকের জন্ম নিবন্ধনের কাজ আটকে দেওয়া হচ্ছে।

সিসিক কার্যালয়ে বসে কীভাবে নির্বাচন অফিসের সংরক্ষিত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে। ‘সাপ্তাহিক তদন্ত রিপোর্ট’-এর দীর্ঘ অনুসন্ধানে এই ঘুষ বাণিজ্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সিলেট নির্বাচন অফিসের কোনো অসাধু চক্রের যোগসাজশে অথবা নির্বাচন কমিশনের সার্ভার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে দিপু এই কাজ করছেন এবং নির্বাচন কর্তৃপক্ষের অগোচরে প্রতিদিন লাখ টাকা ঘুষ হিসেবে হাতিয়ে নিচ্ছেন। অনুসন্ধানী দলের কাছে দিপুর স্বাক্ষরিত একাধিক এনআইডি সার্ভার কপির প্রমাণ সংরক্ষিত রয়েছে, যা এই অবৈধ বাণিজ্যের অকাট্য প্রমাণ বহন করে।

এই প্রাতিষ্ঠানিক জিম্মিদশার শিকার হয়েছেন অসংখ্য সাধারণ নাগরিক। তাদের মধ্যে বাগবাড়ী (লাভলী রোড) এলাকার তুষার মিয়া (পিতা: মোঃ নূর মিয়া), ঘাসিটোলার সুজন আহমদ (পিতা: আব্দুছ ছমির) এবং আনন্দ-৩৮ এলাকার বয়োবৃদ্ধা জয়তুন নেছা (পিতা: মৃত মাহমুদ মিয়া) সাপ্তাহিক তদন্ত রিপোর্টের কাছে এই ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তারা জানান, বাধ্য হয়েই তারা দিপুকে ১০০ টাকা করে দিয়েছেন, নতুবা তাদের জন্ম নিবন্ধনের কার্যক্রম আটকে রাখা হচ্ছিল।

এক ভুক্তভোগী অভিযোগ করে জানান, তিনি স্থানীয় নির্বাচন অফিস থেকে সার্ভার কপি সংগ্রহ করে আনার পরও দিপুর স্বাক্ষর ছাড়া তার কাজ করা হয়নি। বাধ্য হয়ে ১০০ টাকা ঘুষ দিয়ে দিপুর স্বাক্ষর নিতে গেলে এবং সরকারি নিয়ম অনুযায়ী টাকার রসিদ দাবি করলে, দিপু ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে ধমক দিয়ে কক্ষ থেকে বের করে দেন।

আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে পরিচয় যাচাইয়ের জন্য নির্বাচন কমিশন সীমিত ‘ভেরিফিকেশন অ্যাক্সেস’ দিলেও, সার্ভার থেকে নথি ডাউনলোড বা মুদ্রণ করে বাণিজ্যিকভাবে বিতরণ করা সুস্পষ্ট চুক্তি ও আইন লঙ্ঘন। ‘জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন আইন, ২০১০’ এবং সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কিত প্রচলিত আইনের অধীনে অনুমতি ছাড়া সরকারি সংরক্ষিত সার্ভার থেকে তথ্য সংগ্রহ ও ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত দিপু প্রথমে নিজেকে ‘৭১ এর কথা’ পত্রিকার সাংবাদিক পরিচয়ে প্রতিবেদককে হুমকি দেওয়ার চেষ্টা করে। পরে তথ্য-প্রমাণের মুখে কোণঠাসা হয়ে সে জালিয়াতি ও ঘুষ গ্রহণের কথা স্বীকার করে, তবে ধূর্ততার সাথে নিজের দায় চাপাতে চায় সিসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ জাহিদুল ইসলামের ওপর। একইসাথে সে জোন-১ এর অপারেটর রূপককেও এই জালিয়াতি চক্রের সহযোগী হিসেবে ফাঁস করে এবং সংবাদ প্রকাশ না করতে মরিয়া হয়ে আকুতি জানায়। দিপু নির্বাচন কমিশন থেকে সার্ভার অ্যাক্সেস পাওয়ার মিথ্যা দাবি করলেও, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ জাহিদুল ইসলাম তা সম্পূর্ণ নাকচ করে তিনি জানান, ইসির সাথে সিসিকের এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সার্ভার লিংকআপ হয়নি। দিপুর বিরুদ্ধে ওঠা এমন অভিযোগের পূর্ব নজির রয়েছে, তিনি আগামী রবিবারই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।

​অন্যদিকে, সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (যুগ্মসচিব) মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকারও এই ভয়ংকর জালিয়াতির খবর জেনে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় প্রধানের মাধ্যমে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে সিলেটের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার মুঠোফোন বন্ধ থাকায় এ বিষয়ে তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

  • সরকারি একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে এমন প্রকাশ্য চাঁদাবাজি ও হয়রানির ঘটনায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অবিলম্বে এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী নাগরিকরা।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Add



© All rights reserved © tadantareport.com
Design BY Web WORK BD
ThemesBazar-Jowfhowo